আমার অভিজ্ঞতা কিডনি রোগের অনিয়ম এবং আপনার করণীয়

আমার কিডনি রোগ ধরা পড়ে ২০১৫ সালে। এর আগে আমি বুঝতেই পারিনি এত বড় একটি রোগ আমার শরীরে বাসা করেছে।

কিডনি বিকল হওয়ার জন্য আমাদের কিছু অনিয়ম দায়ী। তাই এই অনিয়মগুলো জানা জুরুরী।
কিডনি নষ্টের ১০টি অনিয়ম:
১. প্রস্রাব আটকে
২. পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া
৩. অতিরিক্ত লবণ খাওয়া
৪. যেকোনো সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা না করা
৫. মাংস বেশি খাওয়া
৬. প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া
৭. অপরিমিত ব্যথার ওষুধ সেবন
৮, ওষুধ সেবনে অনিয়ম
৯. অতিরিক্ত মদ খাওয়া
১০. পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়া

এই অনিয়মগুলো না করার মাধ্যমে অধিকাংশ কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা যায়। আমি আমার জীবন থেকে দেখাবো উপরের কোন কোন অনিয়মটি আমার মধ্যে ছিল। অনিয়মগুলোর সাথে সাথে প্রকৃত নিয়ম কি সেটা নিয়েও আলোচনা করব।

অনিয়ম ১। প্রস্রাব আটকে রাখা
এই অনিয়ম টি আমি করতাম না। তবে দূরপাল্লার ভ্রমণের ক্ষেত্রে, কদাচিৎ বাধ্য হতে হতো।

নিয়ম:
যারা কর্মব্যস্ত জীবন পার করেন, বাইরে থাকা অবস্থায় টয়লেটের ব্যবস্থাপনা না থাকায় আমাদের ভুগতে হয়। সীমিত পাবলিক টয়লেট থাকলেও, নোংরা পরিবেশের কারণে আমরা ব্যবহার করতে উৎসাহ বোধ করি না। তারপরও সমাধান রয়েছে।
শপিং মল, রেস্টুরেন্ট কিংবা মসজিদে ব্যবহৃত টয়লেট আপনি ব্যবহার করতে পারেন। এটা পুরুষদের জন্য ভালো সমাধান হলেও, নারীদের জন্য সমাধান কি হবে সেটা আমার জানা নেই। নিকটস্থ হাসপাতাল গুলো এর সমাধান হতে পারে। গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে আপনি শপিংমল রেস্টুরেন্ট বা হাসপাতাল এর লোকেশন সহজে জেনে নিতে পারেন।
বাসা থেকে বের হবার আগেই, টয়লেটের কাজ সেরে নেওয়া ভালো। একইভাবে অফিস বা কারো বাসায় থাকলে বের হবার আগে টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইতস্ততটা করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে আপনি যদি রাস্তায় দুই থেকে তিন ঘণ্টাও থাকেন ইউরিনের অত চাপ তৈরি হবে না। সুস্থ মানুষের ৪ ঘণ্টা পর পর ইউরিন হওয়া স্বাভাবিক।

অনিয়ম ২। পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া
এই অনিয়ম টি আমার ছিল না। টেবিলের পাশে আমার সবসময়ই ২ লিটার পানি থাকতো। দূরে কোথাও গেলে ব্যাগে পানি থাকতো।

নিয়ম:
সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করুন। গরমের সময় এবং অধিক পরিশ্রমে ঘাম বেরিয়ে গেলে পানির পরিমাণ পিপাসা অনুসারে বাড়বে। একটা কথা খেয়াল রাখবেন পানি গ্রহণের পরিমাণ খুব বেশি হলে ক্ষতিকর, কম হলে ক্ষতিকর সেটা তো জানেনই।
বাংলাদেশের বোতল-জাত পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ নিরাপদ নয়। সমাধান হচ্ছে অন্তত ছোট একটি বোতলে নিজের কাছে সবসময় পানি রাখা।
আরেকটা বিষয়, মাংস যখন খাবেন বিশেষত গরুর মাংস, খেয়াল রাখলে দেখবেন পিপাসা বেশি লাগে। এ সময় পানি একটু বেশি খাবেন। আপনি লবণ যদি বেশি খেয়ে থাকেন, পানি কিছুটা বেশি খাবেন। অবশ্যই লবণ বেশি খাওয়া উচিত না।

পানি পানের একটি সুন্দর নিয়ম রয়েছে সুস্থ মানুষের জন্য। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ২ থেকে ৩ গ্লাস পানি খালি পেটে পান করা। আধঘণ্টা পর সকালের খাবার খেয়ে নেওয়া। দুপুরের খাবারের আধঘণ্টা আগে ২ গ্লাস পানি পান করা। রাতের খাবারের দু’ঘণ্টা আগে ২ গ্লাস পানি পান করবেন।
এভাবে দেখা যায় দৈনিক পানির চাহিদার অর্ধেক পানি গ্রহণ করা হয়ে যায়। এটি এক ভাবে যেমন হজমের জন্য দরকারি আবার রক্ত পরিষ্কার করার জন্য কার্যকরী।

অনিয়ম ৩। অতিরিক্ত লবণ খাওয়া
অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস আমার ছিল না অবশ্য। তবে বাসার খাদ্য অভ্যাস কিংবা এদেশে যে ধরনের খাবার পাওয়া যায় সে হিসেবে বলা যায়, অতিরিক্ত লবণ টা খাওয়া হয়েছে আমার। যা পরবর্তীতে আমার উচ্চ রক্তচাপ তৈরির জন্য দায়ী হতে পারে।

নিয়ম:
রান্নায় লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের ৩ থেকে ৪ গ্রামের বেশি লবণ প্রয়োজন নেই। এছাড়া প্রতিটি খাদ্য উপাদানে কিছু না কিছু লবণ থাকে। স্বাদ বৃদ্ধি এবং মুখরোচক খাদ্য তৈরি করার জন্য লবণ অত্যাবশ্যক হলেও আস্তে আস্তে এটি কমিয়ে আনতে হবে। আজকে ঘোষণা দিয়ে কালকেই হয়ত লবণ গ্রহণের পরিমাণ কমাতে পারবেন না। পরিকল্পনা করে আপনি সফল হতে পারবেন।
আমরা অনেক সময়ই পাতে আলগা লবণ খেয়ে থাকি। এটা বর্জন করতে হবে। তরকারিতে আস্তে আস্তে লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। এবং খেয়াল রাখতে হবে লবণ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে। আপনারা যারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে লেবুর শরবত খান সেটাতে কিন্তু প্রচুর লবণ দেয়া হয়। এছাড়া রেস্টুরেন্টের খাবার গুলোতে লবণের পরিমাণ একটু বেশি থাকে। মোট কথা আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে আপনি অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করছেন কি না এবং আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা।
শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য হারালে হৃদরোগসহ নানা রকম শারীরিক জটিলতা তৈরি হবে। আর উচ্চ রক্তচাপ থেকে কিডনি নষ্ট হয় সেটা তো জানতেই পারলেন।
একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন, ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি সহ খনিজ উপাদান লবণ বেরিয়ে যায়। সে সময় স্যালাইন খেয়ে লবণ এবং পানির ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ডায়রিয়ার কারণে ভয়াবহ কিডনি ক্ষতি হতে পারে।

অনিয়ম ৪। যে কোনো সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা না করা
আমার ওরকম কোনও সংক্রমণ হয়নি, চিকিৎসা নিতে হয়নি। তবে ২০১২ সালের দিকে চুল পড়ার এবং খুশকি সমস্যা ছিল। সে সময় এক ডাক্তার ওষুধ দিয়েছিলেন ৮ মাসের, ৩ মাস ব্যবহারে কাজ হয়নি বলে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। অন্য আরেক ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করেছিলাম। তারপরও কাজ হয়নি। চুলের রঙের পরিবর্তন হয়েছিল। এখন এটা জানি প্রোটিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে চুলের রংয়ের পরিবর্তন হতে পারে। হতে পারে সে সময় প্রোটিন গ্রহণ বেশি বা কম হয়েছিল। ডায়রিয়া হয়েছিল, সেটিও পানি খেয়ে সমাধান করেছি, স্যালাইন খেয়ে সমাধান করেছি। কিন্তু ডায়রিয়ার কারণে কিডনির সমস্যা হতে পারে এটা আসলেই তখন জানতাম না।

নিয়ম:
কোন অবস্থাতেই সংক্রমণ রোগ গুলো অবহেলা করবেন না। সেটা গোপন হোক যাই হোক। ভালো ডাক্তার খুঁজে বের করে সমাধান করবেন। মূত্রনালি মূত্র-থলি নানা জায়গায় সংক্রমণ রোগ হতে পারে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সব সময় থাকতে হবে। ব্যবহার করা জিনিসপত্র পরিষ্কার সব সময় রাখতে হবে। আর ঘরবাড়ি টয়লেট পরিষ্কার রাখতে হবে জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে। পাবলিক স্থান গুলো ব্যবহারে ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। হাত ধোয়ার চর্চা সব সময় করতে হবে। অনেককেই দেখি খাবার আগে সামান্য পানি দিয়ে হাত ধৌত করেন। আর খাবার পর সাবান দিয়ে ভাল করে পরিষ্কার করেন। এটা ভুল। কোন কিছু খেতে গেলে অবশ্যই খাওয়ার আগে ভালো করে হাত পরিষ্কার করতে হবে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। হাত ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করবার জন্য, সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে কমপক্ষে ৪৫ সেকেন্ড ভাল করে হাত ধুতে হবে।

অনিয়ম ৫। মাংস বেশি খাওয়া
গরিব মানুষ আমি। গরুর মাংস কেনা হত কদাচিৎ। যা গরুর মাংস খাওয়া হতো যদি বলা হয় বেশি খেয়েছি তবে কোরবানির ঈদে। এবং এটা সবাই খেয়ে থাকে। বলা যায় গরুর মাংস আমি কখনোই বেশি খাই নি বাস্তবতা এটা অসম্ভবও।

নিয়ম:
গবেষণাটি নির্ভরযোগ্য নয়। ধারণা করা হচ্ছে, কিডনি রোগ তৈরিতে লাল মাংস এর অবদান রয়েছে। গরুর মাংস কিংবা মাংস খাওয়া বন্ধ করবেন না জানা আছে। এবং প্রোটিনের উৎস হিসেবে সেটা করা উচিত না। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত মাংস গ্রহণ করা যাবে না। অল্প অল্প করে খেতে পারেন। আপনার দৈনিক প্রোটিন গ্রহণের একটি মাত্রা রয়েছে। মাত্রার অধিক প্রোটিন যদি আপনার শরীরে গ্রহণ করে, সেটার জন্য শরীরের সিস্টেমের বেগ পেতে হয়। আপনি পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করবেন আপনার শরীর সেটি আপনার জন্য কাজে লাগাতে পারবে।

অনিয়ম ৬। প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া
যখন খেতাম তখন ভালো করেই খেতাম। ২০১২-১৩ সালের পর থেকে সকালের খাবার নানা কারণেই খেতে পারতাম না।

নিয়ম:
কোনভাবেই তিন বেলা সকাল, দুপুর এবং রাতের খাবার বাদ দেওয়া যাবে না। খাবারের তালিকায় সুষম খাবার এবং পরিমিত খাবার থাকতে হবে। আপনাদের অনেককেই আমি জানি, যারা সকালে খাবার খান না। আবার অনেকে আছেন যারা দেরি করে রাতের খাবার খান। অভ্যাস গুলো খুবই খারাপ। ঘুম থেকে উঠেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সকালের খাবারটি খেয়ে নিতে হবে। বলা হয়ে থাকে একবারে না খেয়ে সকালে দুবার খাওয়াটা ভালো। সকালের খাবারে অন্তত একটা ডিম থাকতে হবে। সকালের খাবার অবশ্যই সকাল ৯ টার মধ্যে খেয়ে নিতে হবে। অনেকে আলু ভাজি আর রুটি দিয়ে নাস্তা করে থাকেন। খেয়াল রাখবেন আলু এবং রুটি দুটোই কিন্তু শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট। আপনি সকালে প্রোটিন গ্রহণ করছেন। সকালের খাবারে অবশ্যই প্রোটিন থাকতে হবে। একটি ডিম থাকলে সেই প্রোটিনের চাহিদা টা পূরণ হয়ে যাবে। এছাড়া ডাল বা সিমের বিচি প্রোটিনের ভালো উৎস।
দুপুরের খাবার ২টা বাজার আগেই খেয়ে নিতে হবে। খাবারের তালিকায় পরিমিত মাছ-মাংস থাকতে হবে। কয়েক রকমের সবজি থাকা দরকারি। এতে আপনার শরীর দরকারি পুষ্টি উপাদান পাবে।
রাতের খাবার রাত ৯ টার আগে খেয়ে নিতে হবে। এবং খেয়াল রাখতে হবে খেয়ে যাতে না ঘুমিয়ে যান। রাতের খাবার এবং ঘুমিয়ে যাবার মধ্যকার পার্থক্য অন্তত দু’ঘণ্টা হতে হবে।

আমাদের সাধারণের অভ্যাস হচ্ছে, সকালে হালকা নাস্তা করা। দুপুরে মোটামুটি ভারী খাবার খাওয়া তাড়াহুড়া করে। আর রাতের বেলা ভারী খাবার খাওয়া পেট পুরে খাওয়া। এই অভ্যাস টা খুবই অস্বাস্থ্যকর। নিয়ম হচ্ছে সকালে এবং দুপুরে খেতে হবে আপনাকে সবচেয়ে বেশি। রাতে পেট পুরে না খাওয়াই ভালো।
আবার গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে আরেকটি বিস্তারিত লেখা লিখা যাবে। বিশেষজ্ঞরা ৫থেকে ৬ বেলা খাবার গ্রহণে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

অনিয়ম ৭। অপরিমিত ব্যথার ওষুধ সেবন
আমি ব্যথার ওষুধ খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। জ্বর এর জন্য প্যারাসিটামল খেয়েছি যা ক্ষতিকর নয়।

নিয়ম:
আপনাদের অনেক কে জানি, যারা কথায় কথায় পেইন-কিলার খেয়ে থাকেন। এবং আপনাদের মাত্রা জ্ঞান টাও নেই। ব্যথার ওষুধ ৮০ ভাগই কিডনির ক্ষতি করে থাকে।
ব্যথার ওষুধ অবশ্যই পরিমিত গ্রহণ করতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতিরেকে গ্রহণ করা যাবে না।

অনিয়ম ৮। ওষুধ সেবনে অনিয়ম
কথায় কথায় ওষুধ আমি গ্রহণ করতাম না। জ্বর ঠাণ্ডা সর্দি কাশি সামান্য অসুখে ওষুধ গ্রহণ করিনি। ২০১২-১৩ সালে ডাক্তার আট মাসের ওষুধ দিয়ে ছিলেন তিন মাস খেয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

নিয়ম:
ওষুধ সেবনে অবশ্যই সঠিকভাবে সঠিক সময়ে গ্রহণ করতে হবে। কোন ভাবেই কোন বেলা ওষুধ বাদ দেয়া যাবে না। অনেক ওষুধের ডোজের সময় সীমা থাকে। সে সকল ওষুধ অবশ্যই ডোজ সম্পূর্ণ করতে হবে। খাবার আগের ওষুধ খাবার আগে, খাবার পরের ওষুধ খাবার পরে গ্রহণ করতে হবে। সকালের ওষুধ দুপুরে বা দুপুরের ওষুধ রাতে গ্রহণ করা যাবে না। কিছু ওষুধ আছে যেগুলো ঘণ্টা ধরে খেতে হয়, যেমন ১২ ঘণ্টা পর পর বা ২৪ ঘণ্টা পর পর। ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে সেটা অনুসরণ করতে হবে। ওষুধ গ্রহণ ওভার-ডোজ হয়ে গেলে করণীয় কি ডাক্তার কাছে জেনে নিতে হবে।

অনিয়ম ৯। অতিরিক্ত মদ খাওয়া
মদ খাওয়ার সাহস তো করতে পারিনি অতিরিক্ত খাব কি 😂

নিয়ম:
এটা নিয়ে যেহেতু আমি জানি কম বলা ঠিক নয়। যতটুকু পড়াশোনা করে দেখেছি, মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ ক্ষতিকর। শুধু কিডনি না লিভারের ক্ষতিও করে।
ওয়াইন বিয়ার এগুলো মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ করা যাবে না। কোমল পানীয় এনার্জি ড্রিংক শরীরের জন্য সবসময় ক্ষতিকর। এখানে একটি কথা খাটে, একবারে যেহেতু বর্জন করতে পারবেন না আস্তে আস্তে কমিয়ে এনে অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।

অনিয়ম ১০। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়া
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া হতো না। যখন পরিশ্রম করতাম বিশ্রাম নিতে হবে এমনটা মনে হতো না। ঘুমের অনিয়ম হত।

নিয়ম:
টানা পরিশ্রম করা যাবে না। থেমে থেমে বিশ্রাম নিতে হবে। স্বাভাবিক ঘুম ঘুমাতে হবে। দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম সুস্থ মানুষের জন্য স্বাভাবিক। কারো কারো জন্য এর পরিমাণ বেশি হতে পারে। কেবল সুস্থ থাকার জন্য নয় প্রোডাক্টিভ কাজের জন্য প্রতি ২ ঘণ্টা ব্যবধানে ২০ মিনিট বিশ্রাম নিতে হবে।
অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটেন। হাঁটার ক্ষেত্রেও বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে হাঁটতে হবে টানা হাটা যাবে না।
রাত ১১ টার আগে ঘুমানো সব থেকে ভালো। কোন কারণে রাত জাগতে হলে ওই দিনের ঘুম অবশ্যই দিনের বেলা ঘুমিয়ে পুষিয়ে দিতে হবে। অনেকে রাতের বেলা কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে যান, তারা মেডিকেল চেকআপ এর মধ্যে থাকবেন। কারণ আপনি স্বাভাবিক সুস্থ শরীর বৃত্তীয় কাজের ব্যাঘাত ঘটিয়ে নতুন একটি সাইকেল তৈরি করেছেন। সেটি শরীরের সাথে এডজাস্ট নাও হতে পারে।
অনেকে আমাকে বলেন, তার ঘুম আসে না। এরকম যাকেই পাল্টা জিজ্ঞাসা করেছি আপনি কি ঘুমানোর সময় মোবাইল ফোন স্ক্রিন স্ক্রল করেন। উত্তর এসেছে হ্যাঁ। ডিজিটাল স্ক্রিন ল্যাপটপ, মোবাইল ইত্যাদি এর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘুম আসবে না। ভাল ঘুম আসার জন্য কিছু ভাল নিয়ম আছে। মন্তব্যে জানতে চাইলে সেসব নিয়ে লেখা যাবে।

আরও কিছু নিয়ম কানুন:
এগুলো হচ্ছে অনিয়মের বিপরীতে নিয়ম। সুস্থ শরীরে নীরোগ বসবাস করতে চাইলে, আরও কিছু ছোট ছোট নিয়ম মানতে হবে। নিয়মকানুন গুলো খুব কঠিন যে তা নয়, তবে মনে রেখে রেখে অভ্যাসে পরিণত করা টা চর্চার ব্যাপার। আপনি যদি মনে করেন তাহলেই অভ্যাসে পরিণত করতে পারবেন। এম নিয়মগুলোর একটি সুন্দর তালিকা রয়েছে আগ্রহীরা যোগাযোগ করলে আমি তাদেরকে দেব। এখানে খেয়াল করলে দেখবেন, কিডনি প্রতিরোধ করার জন্য আপনাকে কোন কিছুই বর্জন করতে বলা হচ্ছে না। কেবল পরিমিত এবং নিয়ম মেনে গ্রহণ করার জন্য বলা হচ্ছে।
মাদক সিগারেট শরীরের জন্য কোনোভাবেই ভালো নয়। এটা বর্জন করতে হবে।

আপনার শরীরের সাথে আপনার যোগাযোগ থাকতে হবে। শরীর কি বলে কি চায় সেটা বোঝার চেষ্টা করবেন। শরীরের কোন অসুবিধা হলে সে আপনাকে সিগন্যাল দিবে। সিগনাল থেকে আপনি অনেক বড় অসুখের সর্তকতা পাবেন। তাই সিগন্যাল অনুসারে ব্যবস্থা আপনাকেই নিতে হবে। কিডনি নষ্ট হওয়ার আগে শরীর আমাকে অনেক সিগনাল ই দিয়েছে। হতে পারে আমি সেগুলো বুঝতে পারিনি বা গুরুত্ব দেয়নি। এই যেমন ধরুন আমার প্রায়ই জ্বর হত। রাতে ঘুমাতে সমস্যা হতো। চুল পড়ে যাচ্ছিল এবং চুলের রং লালচে হয়ে গিয়েছিল। হেঁচকি উঠত অনেকক্ষণ পর থামত। খাবার খাবার সময় অনেক খাবার গন্ধ গন্ধ লাগতো। অনেকক্ষণ পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না পা ব্যথা করত। মাংস পেশিতে টান খেত। মাংসের ভিতর থেকে কেমন যেন অস্বস্তি লাগতো। অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যেতাম। খাবার রুচি একেবারেই ছিল না।
শরীরের উপর নির্যাতন করবেন না। তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিবেন। আপনার যেমন মেজাজ বিগড়াতে পারে শরীর তেমন বিদ্রোহ করতে পারে। তাই সাবধান।

যে ব্যক্তি তার শরীরকে ভাল বুঝতে পারে, সে অসুখ বিসুখে ভুগবে কম। তাই গড়ে তুলেন নিজ শরীরের সাথে বন্ধুত্ব।

হ্যালো, আপনাকে বলছি,
যারা এই লেখাটা পুরোটা পড়ে নিচ পর্যন্ত এসেছেন তাদের ধন্যবাদ। আমি ধরে নিতে পারি, আপনার নিয়মগুলো মানতে আগ্রহী। কিছু দিন আগে করা আমার বন্ধুদের মধ্যে জরিপে দেখা যায়, এই নিয়মগুলো একাধিক অনিয়ম করেন অধিকাংশরা। এখন পর্যন্ত জরিপে, ২৭ জনের মধ্যে ২৩ জনই অনিয়ম করেন। আপনাদের বন্ধু আমি, আর আমি এত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হলাম তারপরও আপনারা কি সতর্ক হবেন না?

সামান্য একটা ইনজেকশনের সুচ ভয় করেন, আর সেই সুচ থেকে কয়েকগুণ মোটা সুচ যখন সপ্তাহে তিনদিন হাতের দুই জায়গা দিয়ে ঢুকানো হবে তখন কি রকম লাগতে পারে একটু কল্পনা করে দেখতে পারে। কল্পনা করে দেখতে পারেন, ৪ টা ঘণ্টা ধরে সপ্তাহে ৩ দিন এই মোটা সুচ লাগানো অবস্থায় ডায়ালাইসিস বেডে শুয়ে থাকা কেমন লাগতে পারে?
আর যখন রক্তচাপ আপডাউন করবে, হঠাৎ অসহনীয় গরম আর মাথা ব্যথা করবে? কিংবা যখন রক্তচাপ কমে গিয়ে চোখে অন্ধকার দেখা যাবে সেই সময়গুলো এই রোগীদের কেমন যায় ভাবুন।
একটি হাতে সারা জীবনের জন্য করা হবে ফিস্টুলা। যা আস্তে আস্তে ফুলে যাবে। সারাজীবন সতর্কতার সাথে থাকা লাগবে। কারণ এটি আপনার লাইফ লাইন। এছাড়া কত কতবার যে অপারেশন থিয়েটারে যেতে হতে পারে, তার ঠিক নাই। হয়ে যাতে পারে যখন তখন স্ট্রোক বা হার্ট এ্যাটাক, ফুসফুসে পানি জমা, সেই থেকে ক্যান্সার।

একবার কিডনি বিকল হলে তার আর ফেরার পথ নেই। এখন জীবনটা তার কাছে মৃত্যুকে বিলম্বিত করা। ডায়ালাইসিস কিংবা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট এখনও কোন ভাল সমাধান নয়। ট্রান্সপ্লান্টে কোন রোগী সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন না। একটা সময় ব্যাপী ভাল থাকেন মাত্র। আর সেই ভাল থাকার জন্য তাকে প্রচুর পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করে যেতে হয়। নিয়মকানুনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

এত এত বিপদ, অথচ নিয়মগুলো কি সামান্য না? তাই মানুন। মানতে থাকুন। জীবনকে নিয়ে ভাবুন।

বি:দ্র: তথ্যগত ভুল থাকলে জানাবেন সংশোধন করা হবে। বানান ভুল থাকতে পারে মন্তব্য করলে ঠিক করে দেয়া হবে।

প্রকাশিত: বিজ্ঞান ব্লগ, একলোটনের সাদাখাতা

ঢাকার গলিপথ শেষ হতে থাকা সকাল

সময়টা এখন কি চমৎকার! সূর্য দিনে দিনে হেলতে থাকে। সকালের রোদটা খুব একটা শরীরে লাগে না, ঠিক যেন মিষ্টি রোদ। গলির রাস্তায় মানুষের স্বাভাবিক কোলাহল। গরমের উত্তাপ নেই। ঠিক গরম না ঠান্ডাও না, মাঝামাঝি রকমের। শীতলতা।
বারান্দায় দাঁড়ালে মানুষের কর্ম ব্যস্ততা দেখা যায়। ঠেলাগাড়ি ইট নিয়ে এসেছে। ছন্দে ছন্দে ইট নামিয়ে নিচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ। সবজি ফেরিওয়ালা ডেকে যাচ্ছে। বড় পাতিল মাথায় নিয়ে মাছ মাছ বলে হেঁকে যাচ্ছে মাছওয়ালা। উল্টো করে কয়েক হালি ঝোলানো মুরগি হাতে মাঝে মাঝে মুরগিওয়ালার দেখাও মেলে। ওই মুরগি-ইইই বলে লম্বা একটা টান মেরে বিজ্ঞাপন করতে করতে যাচ্ছেন। পথিমধ্যে কোন ভদ্রলোক ডেকে নিয়ে দরদাম করছেন।
দুপুর হবে হবে এমন সময় মা’দের দেখা মেলে সন্তানের ব্যাগ হাতে ফিরছেন বাসায়। ব্যাগমুক্ত হয়ে সন্তানেরা আনন্দ করতে করতে বাসায় ফিরছে। আরেকদল কিশোর-কিশোরীকে দেখা যায় মাঝে মাঝে স্কুল কলেজের ড্রেস পরে দ্রুত যাবার চেষ্টায় আছে।
বারান্দা থেকে নেমে রাস্তায় যদি একটু আগানো যায়, গলির মোড়ে চায়ের দোকান কিংবা ঐ সিংগারার দোকানটাতে দেখা যাবে বসেছে আড্ডা। তেলে ভাজা রুটি আর সবজির গন্ধ এখনো চারপাশে আছে। দোকানের পাশেই দেখা যাবে, এঁটো প্লেট ফেলে রাখা হয়েছে ধোয়া হবে বলে।
এছাড়া এবেলায় আরো ডেকে যায় ঝাড়ুওয়ালা, হাড়ি-পাতিল-বাসনওয়ালা আরো নানা রকম ফেরিওয়ালা। ছোট এক মাইকে চেঁচিয়ে ইদুর মারার তেলাপোকা মারার ওষুধ বিজ্ঞাপন করতে করতে যাচ্ছে। দেখা মেলে কদাচিৎ, ভ্যানে অনেক বই সাজিয়ে, গান বাজিয়ে চলছে টুপিওয়ালা বিক্রেতা। ভ্যানে সাজান নানা রকমের বই, নানা রকমের কথিত ওষুধ শিশির দেখা মেলে। বলা হচ্ছে, অমুক আমলের অমুক হবে, অমুক ভেষজে অমুক অসুখ সারবে। বেকার মানুষ আমার মত কাজ নেই যার দাঁড়িয়ে, দু’ একটা বইয়ের পাতা উল্টিয়ে দেখে। কেনার সামর্থ্য নেই বলে, কিছুক্ষণ পায়চারি করে আবার হাঁটা দিয়ে চলতে থাকে।
গলির আরেকটু সামনে যদি আগানো যায় ওই যে ফাঁকা জায়গাটা, ছোটবেলায় খেলতাম খুব সবাই মিলে। ওইখানে পাইলিং চলছে উচ্চ শব্দ করে। আমার মতো মানুষেরা কাজ নেই যাদের, দল বেঁধে মানুষ তামাশা দেখছে।

এইযে ঢাকার রাস্তার গলি, সব কি একই রকম চিত্র দেখা যায় সব সময়, সব ঋতুতে? না বোধ হয়। শীত আগমন এর আগে ঠিক এই সময়টাতে একটু অন্যরকম খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন। ভেতরে ভেতরে শান্তির একটা অনুভব পাওয়া যায়। গরমে শীতে কিংবা বর্ষায় আপনি ঢাকার গলি এমন করে অনুভব করতে পারবেন না। আপনার হয় ক্লান্তি লাগবে, নয়তো আপনার অসহ্য লাগবে। এই সময়টাতে আপনার ক্লান্তি লাগবে না, মনে হবে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ধরে এই গলি পথে আপনি হাঁটতে পারবেন।
লিখতে লিখতে দুপুর হয়ে গেলো। দুপুরের ছবি আবার অন্যরকম হয়ে যায়।